বজ্রহানা দাও
91
রুক্মীনি ও রাধা
কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে গেলে রাধা কাঁদে বসে
রুক্মীনিকে কেড়ে এনে তাকেই ভালোবাসে ।
মথুরার বিদর্ভ কন্যা তাকেই বিয়ে করে
শ্রীকৃষ্ণ রাধার প্রেম সব কি তবে মিছে ?
মহাভারতে ঠাঁই হয়নি রাধার প্রেমগাথা
পুরাণ বলে যে রুক্মীনি সেই ছিল রাধা ।
-------------------------
92 অনন্য উপহার
তখন একমাত্র পুত্রই সব ধ্যানজ্ঞান
স্বামী,কন্যা আর সবাই নেহাৎই ফেলনা ।
পুত্রকে ডাক্তার ইঞ্জিনীয়ার নয়তো বড় অফিসার
করতে হবে ,
সব চাইতে ভালো স্কুল ,কলেজ,এবং শিক্ষক চাই ।
উদায়স্ত খেটে স্বামীর নাভিশ্বাস তবু ও চলে না ।
রমা টিউশনী ধরে, রান্নার মাসী ছাঁটাই
ছেলের শিক্ষায় যেন না হয় কোন খামতী ।
অবহেলা আর অফুরন্ত পরিশ্রম শেষে
একদিন স্বামী সংসার ছেড়ে চির বিদায় নেয় হঠাৎ ।
ততদিনে ছেলে স্বয়ংম্ভর,ভাল চাকরী ভাল বিয়ে
সংসার ফুরফুরে প্রজাপতির মতো রঙীন ।
বছর না ঘুরতেই বৌমার আসল চেহারা একটু একটু করে ,
এখন ছেলের আর সময় হয় না মাকে দেখবার ,
সে এখন ব্যস্ত তার বৌ ,মেয়ে ,কর্মজীবন
ঘর দোর সাজানো,অতিথি আপ্যায়ন বৌয়ের সেবা ।
রমার নাওয়া খাওয়ার ঠিক নেই ,অসুস্হ শরীর ।
বৌ ঠিকমতো খেতে দেয় না তার খবর কে নেবে ?
ছেলের মেজাজ চড়া, বৌয়ের কথায় ওঠে বসে
রমাকে ধমকায় ,বলে যদি না পোষায়
যাও বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোনখানে ।
এখানে থাকতে হলে আমাদের ইচ্ছের সঙ্গে
নিজেকে মেলাতে হবে ।
আমরা যেমন দেব তাতেই সন্তুষ্ট হবে
চলবে না আবদার ।
এই ছেলের জন্য স্বামীকে অবহেলা করেছে
দিন রাত্রি বছরের পর বছর
মেয়েরা রাগ করেছে হয়ে গেছে পর ।
এখন রমার আর অন্য কোন গতি নেই
একমাত্র উপায় বৃদ্ধাশ্রম
ছেলেকে মানুষ করার অনন্য উপহার ।
----------------------------
93
এভাবেই কাটবে জীবন ?
যারা আমার বন্ধু
যাদের সঙ্গে ব্যাটিং এ তুলছি রাণ
তাদের দেখো ফাটাঁ ব্যাট নিয়েও
নিশ্চিন্তে যাচ্ছে খেলে ;
আমাকে বাহবা দিচ্ছে কখন ও বিদ্রূপ
অথচ কোন মানে হয় না
আমি জাত খেলুড়ে নই মোটেই
শূন্য রাণের উমেদার ।
হিমালয় কেন উত্তরে ,সূর্য্য কেন আগুন
ইত্যাদী প্রশ্ন করে আমাকে নাজেহাল ।
কখনও খুশী হয়ে পিঠ চাপড়ায়
কখনও বলে অহংকার ।
অথচ কি আশ্চর্য এই বলেই আউট হয়ে
প্যাভিলিয়নে যাচ্ছি ফিরে ।
নতুন কিছু করার ইচ্ছে নেই ,বেশ আছি ।
এভাবেই কাটবে জীবন ?
ভাঙ্গা ব্যাট, ভাঙ্গা পীচ কিন্তু আমাকে রাণ তুলতেই হবে
বন্ধুদের মধ্য থেকে আমাকে উঠতেই হবে ।
৪/৪/১৯৭১
---------------------------
94
ব্যর্থ প্রয়াস
একা একা পথ চলি দু চাকার সাইকেল পিঠ পেতে দেয়
নৈশ্বব্দের অন্ধকারে চিন্তার ঝিনুকে মুক্তো রাশি রাশি
ডুব দিয়ে তুলে এনে সাজাবো অর্ঘ ডালি শব্দ গেঁথে গেথেঁ
তাই চলি নিরালায় যেখানে স্হিত দুধে পরে যাবে সর ।
অর্বাচীন কথা বলে কেটে গেছে যে সময় তাকে ভেবে ভেবে
বিশ্লেষণ ভাজেঁ ভাজেঁ একটি মুক্তোর মালা গাথাঁ হয়ে যাবে
সে আশায় একা থাকি একা দেখি কোলাকুলি আকাশ মাটিতে12:29 PM 6/5/2018
ঘাসের গোপন প্রেম এ মাটির ভাজেঁ ভাজেঁ শুনি কানে কানে ।
অথচ এ শূন্যতার নিস্তব্ধ বেদনাতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাই
একটি নিটোল ভ্রমর কি করে রাখবো ধরে সোনার কৌটায়
কিছুতে হয়না সৃষ্টি অঙ্কুরে বিনষ্ট হয় সমস্ত প্রয়াস
এলোমেলো রত্নরাজি নিঃসীম একাকীত্বে কাচঁ হয়ে যায় ।
------------------------------
95
সময়কে যে সময় পেয়ে যাই একা
কাধেঁ হাত দিয়ে তাকে নিয়ে যাই আরো বহু দূরে ;
সেখানে ভাবনারাজি মূর্তিময় হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভঙ্গীতে
অকথিত বহু ব্যথা একে একে জমা হয় প্রাণ পাবে বলে
এবং কি আশ্চর্য ক্রমে সব চলে যায় তোমার মূর্ত্তিতে ।
তোমাকে চিন্তায় পেলে মুখোমুখি দেখা করি জীবনের সাথে
সে আমাকে কি দিয়েছে ,বিক্ষুব্ধ এ রাতখানি বিশ্রামের নয় ।
রাত জেগে দেখি আমি কোথায় পেচঁক ধরে নেংটি ইদুঁর
অথবা কোথায় মগ্ন রাত্রের কারবারী নক্ষত্র আলোতে ।
২৭/৪/৭১
----------------------------
96 কবিতা মানেই ব্যর্থতা
আমি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছি
দৈনন্দিন কাজের চোরাবালিতে।
তাস,দাবা আড্ডা আর আনন্দের হুল্লোড়
এতদিনের একমাত্র সঙ্গী
এখন আমায় ক্ষমা করো আমি যাই ।
মনের দ্রবণ অধঃক্ষেপ ফেলবে কি
কবিতা তুমি মননে আসবে কি ?
বিক্রিয়ক কোন চিন্তা আদৌ নেই
তোমাকে রূপ রং রসে সাজাতে পারছি কোথায় ?
আবোল তাবোল শব্দের প্যাঁচ এসব কষে লাভ নেই
মূল্য বোধের টানাপোড়েন কবিতা মানেই ব্যর্থতা ।
----------------------------------
97 এখন শরণার্থী ।
বাংলাদেশে আমার কি ছিল মনে নেই
ঊনিশ বিঘে জমিতে সোনার মতো পাকা ধান
ঘরে আসবার জন্য ছিল অপেক্ষায় ?
বড় বড় দুটো পুকুরে মাছ লাফাছ্ছিল আনন্দে ।
গত বছর যে নতুন দালান তৈরী হয়েছিল
তার একটা ইট ও আনতে পারিনি ।
ঘরে পিতল কাঁসা আসবাব পত্র সব রয়েছে
ফলের বাগান ফুলের বাগান যেখানে যেমন ।
হতে পারে সবকিছু তেমনি আছে ।
এই প্রাণটা রেডিয়ামের , পুত্রকন্যা সপরিবার
তাইতো হাতের মুঠোয় নিয়ে পালিয়ে এলাম
সবের মায়া ছেড়ে দিয়ে
দিব্যি কেমন ক্যাম্পে এখন শরণার্থী ।
১৯৭১ সালে লেখা
--------------------------
98
তোমরাই সত্যি
ট্রেনে যেতে যেতে ট্রেনের অস্তিত্ত্বটাকে
কখনও সম্পূর্ণ ভুলি
মনে হয় কামরা নয়, এ আমার তৈরী করা
সুসজ্জিত ঘর ।
এ পথ পরিক্রমায় তোমাদের ভুলে যাই কখন ও
নিশ্চিন্তে অন্যান্য চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে থাকি সত্যি ।
তখন সেটাই বাস্তব এ জীবন কর্মময় সংঘাতে সর্পিল ।
নিজেকে ব্যর্থ মেনে ধাপে ধাপে উঠে যেতে চাই
অথচ সত্যি যেটা ইষ্টিশন প্রেম হয় ট্রেন থেমে যায়
তাই আবার ভেবে দেখি তোমরাই সত্যি বটে আর কিছু নয় ।
বন্ধ ঘর একঘেয়ে ট্রেনেতে যখন ঝিমুই
ইষ্টিশন হইচই বলে দেয় নামার সময় ।
১০/৮/৭২
--------------------
99 শিশু হয়ে যাই ।
তোমার বয়স যখন তিরিশ চল্লিশ পঞ্চাশ
পার হয়ে যাবে
তোমার পাওয়ার আকাঙ্খা
ক্রমশঃই আশঙ্কায় পরিণত হয়ে
কমতে কমতে শূন্যের কাছে যাবে
কিন্তু কখনই শূন্য হবে না ।
মাথাটাকে হাতের তালুতে রেখে
শুয়ে আছি শূন্যে
সম্রাটের মতো পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে ।
পাওয়া না পাওয়ার পথ বেয়ে
নিতান্ত বিরক্তি নিয়ে
অনেক পাওয়ার আশা
ক্রমশঃই ছেটে ছুটে দিই ।
বয়সের নুড়িগুলো ,না পাওয়ার বেদনা
লোফালুফি করতে করতে
ছোট হতে হতে
সব ভুলে যাই ,
শিশু হয়ে যাই ।
----------------------------
100 বজ্রহানা দাও
পরিপূর্ণ আব্রুহীন রাস্তাটার মতো
তোমাদের শিলীভূত অস্তিত্ত্বের শিরঁদাড়া দিয়ে
অনেক অনেক অন্যায় প্রতিদিন
সোনা হয়ে যায়
মুক্তো হয়ে হেসে ওঠে তোমার ক্ষুধায় ।
তবু কি এখনও তুমি
দীর্ণ বিদীর্ণ হয়ে প্রতি অভিঘাতে
এদের ক্ষুধার যজ্ঞে আত্মাহুতি দিয়ে
নচিকেতা হবে ?
চিৎপটাং অসহায় রাস্তাটার মতো
বেচেঁ থেকে কি লাভ ?
তার চেয়ে এস না বন্ধু
কিছু সুখ কিছু সাধ তৃপ্ত হয়ে যাক ।
বিদ্যুৎ গরিলা হও রক্ত ও নিশ্বাসে
রাস্তার সমস্ত পিঠ ঢেকে দাও গভীর বিশ্বাসে ।
জমা থাক বিস্ফোটক অতল গভীরে
একটা বোতাম টিপে সময়ের নাভীদেশে
এদের সুখের স্বর্গে বজ্রহানা দাও ।
------------------------------
Comments
Post a Comment